পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্তে তীব্র সংঘর্ষ: পাল্টাপাল্টি হামলা ও হতাহতের দাবি
পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা চরমে
পাল্টাপাল্টি হামলা, হতাহতের দাবি–পাল্টা দাবি
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ডুরান্ড লাইন ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান, পাল্টাপাল্টি বিমান হামলা এবং কূটনৈতিক তৎপরতায় দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক আবারও সংঘাতের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
তালেবানের দাবি: ৫৫ পাকিস্তানি সেনা নিহত
আফগানিস্তানের তালেবান সরকার দাবি করেছে, গত বুধবার রাতে ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানি সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে তারা বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে। তালেবান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, রাত ৮টা থেকে শুরু হওয়া অভিযান টানা চার ঘণ্টা চলে।
তাদের দাবি অনুযায়ী:
-
৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত
-
১৯টি সামরিক চৌকি ও ২টি ঘাঁটি দখল
-
একটি ট্যাংক ধ্বংস
-
একটি সামরিক যান জব্দ
-
বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার
তালেবান আরও জানিয়েছে, এই অভিযানে তাদের ৮ যোদ্ধা নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
পাকিস্তানের পাল্টা দাবি: ১৩৩ তালেবান নিহত
অন্যদিকে পাকিস্তান বলছে, তাদের অভিযানে এখন পর্যন্ত ১৩৩ জন আফগান তালেবান নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি জানিয়েছেন:
-
২৭টি তালেবান সামরিক পোস্ট ধ্বংস
-
৯টি পোস্ট দখল
-
৮০টির বেশি ট্যাংক ও সামরিক যান ধ্বংস
তবে এসব তথ্যও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন,
“প্রিয় মাতৃভূমির প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। যথাযথ ও শক্তভাবে প্রতিটি আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে।”
বিমান হামলা ও বেসামরিক হতাহত
সংঘাতের সূচনা হয় ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলার পর। জাতিসংঘের সহায়তা মিশন জানিয়েছে, নানগারহার প্রদেশে ওই হামলায় অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকা শহরেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে আহত নারী ও সাধারণ নাগরিকদের চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
তালেবান মুখপাত্রের পোস্ট সরানো
তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলার দাবি করে পোস্ট দিয়েছিলেন। তবে পরে সেই পোস্ট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে আগে হামলা চালানোর অভিযোগ তুলছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
জাতিসংঘের উদ্বেগ
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সীমান্তে বাড়তে থাকা সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি দুই দেশকে উত্তেজনা কমিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এগোনোর আহ্বান জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
ইরানের আহ্বান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সংলাপ ও সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের মাধ্যমে কাবুল ও ইসলামাবাদকে বিরোধ মেটানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রয়োজন হলে তেহরান মধ্যস্থতায় সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
সৌদি আরবের কূটনৈতিক উদ্যোগ
সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে ফোনে আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও উত্তেজনা কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সীমান্ত উত্তেজনার পটভূমি
আফগানিস্তান–পাকিস্তান সীমান্ত প্রায় ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পার্বত্য অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। ঐতিহাসিকভাবে এই ডুরান্ড লাইন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সীমান্তে সংঘর্ষের ঘটনা বেড়েছে।
প্রতিবারের মতো এবারও উভয় দেশ বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করছে, তবে নিরপেক্ষভাবে সেগুলো যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী:
-
সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত
-
কাবুল ও কান্দাহারে বিস্ফোরণের ঘটনা
-
দুই দেশই “আত্মরক্ষামূলক অভিযান” চালানোর দাবি করছে
-
আন্তর্জাতিক মহল সংলাপের আহ্বান জানাচ্ছে
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে এই সীমান্ত সংঘাত বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতায় রূপ নিতে পারে।
উপসংহার
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা শুধু দুই দেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলা, হতাহতের বাড়তে থাকা সংখ্যা এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এখন সবার দৃষ্টি আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা ও কূটনৈতিক আলোচনার দিকে—এই সংঘাত কি সংলাপের মাধ্যমে থামবে, নাকি আরও বড় সংঘর্ষে রূপ নেবে, সেটিই দেখার বিষয়।

No comments